ইসলামে শিরক: মূর্তিপূজার চেয়েও ভয়ংকর যে শিরকে ডুবে আছে আধুনিক বিশ্ব!

শিরক মানে কি শুধু মূর্তিপূজা? জানুন আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিরক সম্পর্কে, যেখানে আল্লাহর আইনকে প্রত্যাখ্যান করে মানুষের তৈরি মতবাদ (গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র) গ্রহণ করা হয়। কুরআনের আলোকে এক গভীর বিশ্লেষণ।

Aug 19, 2025 - 12:46
 0
ইসলামে শিরক: মূর্তিপূজার চেয়েও ভয়ংকর যে শিরকে ডুবে আছে আধুনিক বিশ্ব!
Ai Generated Image

ইসলামে শিরক: মূর্তিপূজার চেয়েও ভয়ংকর যে শিরকে ডুবে আছে আধুনিক বিশ্ব!

ভূমিকা: শিরকের পরিচিত চেহারা এবং তার আড়ালে থাকা সর্বগ্রাসী রূপ

যখন আমরা ‘শিরক’ শব্দটি শুনি, আমাদের চোখে ভেসে ওঠে পাথরের মূর্তি, গাছ বা কবরের সামনে মাথা নত করা কোনো ব্যক্তির ছবি। নিঃসন্দেহে এগুলো শিরকের সুস্পষ্ট এবং ঘৃণ্য রূপ। ইসলাম এসেছেই মানুষকে এই ধরনের প্রকাশ্য দাসত্ব থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর ইবাদতে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু কী হবে যদি আপনাকে বলা হয়, আজকের পৃথিবীতে এর চেয়েও বড়, এর চেয়েও সূক্ষ্ম এবং সর্বগ্রাসী এক শিরক সংঘটিত হচ্ছে, যাতে কোটি কোটি মানুষ कळ বা অজ্ঞাতে লিপ্ত?

এই শিরক কোনো মূর্তির সামনে সিজদা করা নয়, বরং এটি হলো মানুষের তৈরি জীবন ব্যবস্থার সামনে আত্মসমর্পণ করা। এটি হলো আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করে মানুষের সার্বভৌমত্বকে মেনে নেওয়া। এটি হলো আল্লাহর নাযিল করা জীবনবিধান, পবিত্র কুরআনকে বাদ দিয়ে মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত মতবাদ—যেমন গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে জীবন পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা। এটিই হলো আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিরক—**শিরক ফিল হুকুম (শাসনে অংশীদারিত্ব)** বা **তাওহীদুল হাকিমিয়্যার (আল্লাহর সার্বভৌমত্বের একত্ববাদ)** লঙ্ঘন।

এই প্রবন্ধে আমরা শিরকের প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে কুরআনের আলোকে বিশ্লেষণ করব, কেন আল্লাহর বিধানকে প্রত্যাখ্যান করা মূর্তিপূজার চেয়েও خطرناک এবং কীভাবে এই শিরক আমাদের ঈমানের ভিত্তিমূলে আঘাত হানে।

শিরকের পরিচিত রূপগুলো: একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা

মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে, শিরকের প্রধান প্রকারভেদগুলো সংক্ষেপে মনে করিয়ে দেওয়া আবশ্যক:

  1. শিরকে রুবূবিয়্যাত (প্রভুত্বে): আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে স্রষ্টা, রিযিকদাতা বা মহাবিশ্বের পরিচালক মনে করা।
  2. শিরকে উলূহিয়্যাত (ইবাদতে): আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য ইবাদতের কোনো অংশ (যেমন: দোয়া, সিজদা, মানত) নিবেদন করা।
  3. শিরকে আসমা ওয়া সিফাত (নাম ও গুণে): আল্লাহর গুণাবলিকে সৃষ্টির ওপর আরোপ করা বা সৃষ্টিকে আল্লাহর গুণ দেওয়া।

এই সবগুলোই মারাত্মক গুনাহ। কিন্তু এগুলোর মূল روح হলো আল্লাহর অধিকারকে অন্যের জন্য সাব্যস্ত করা। এখন আমরা দেখব, কীভাবে আধুনিক জীবনব্যবস্থাগুলো এই প্রতিটি প্রকার শিরককে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিরক: আল্লাহর সার্বভৌমত্ব (الحاكمية) অস্বীকার

ইসলামের মৌলিক আকিদা হলো, সার্বভৌমত্বের একমাত্র মালিক আল্লাহ। আইন ও বিধান দেওয়ার অধিকার (Authority to Legislate) কেবল তাঁরই। حلال ও حرام নির্ধারণ করার ক্ষমতা তিনি ছাড়া আর কারো নেই। এটিই তাওহীদের মূল ভিত্তি। আল্লাহ কুরআনে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন:

“জেনে রেখো, সৃষ্টি যার, বিধান দেওয়ার অধিকারও কেবল তাঁরই।” — (সূরা আল-আ'রাফ: ৫৪)

অন্য আয়াতে তিনি আরও স্পষ্টভাবে বলেন:

“বিধান দেওয়ার অধিকার আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া আর কারো ইবাদত করবে না। এটাই সরল-সঠিক দ্বীন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।” — (সূরা ইউসুফ: ৪০)

এই আয়াতটি দুটি বিষয়কে এক করে দিয়েছে: (১) বিধান দেওয়ার অধিকার কেবল আল্লাহর এবং (২) এটাই হলো ইবাদতের মূল ভিত্তি। অর্থাৎ, আল্লাহর বিধানকে একমাত্র আইন হিসেবে মেনে নেওয়াই হলো তাঁর ইবাদত। আর তা প্রত্যাখ্যান করে অন্য কারো বিধান মানা হলো সেই সত্তার ইবাদত করা, যা সুস্পষ্ট শিরক।

কুরআনের দৃষ্টিতে মানুষের তৈরি বিধান

যারা আল্লাহর নাযিল করা বিধান অনুসারে বিচার-ফায়সালা বা শাসন করে না, কুরআন তাদের পরিচয় অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তুলে ধরেছে:

“আর যারা আল্লাহর নাযিল করা বিধান অনুযায়ী শাসন করে না, তারাই কাফির।” — (সূরা আল-মায়িদাহ: ৪৪)
“...তারাই যালিম।” — (সূরা আল-মায়িদাহ: ৪৫)
“...তারাই ফাসিক।” — (সূরা আল-মায়িদাহ: ৪৭)

ইবনে আব্বাস (রাঃ) সহ অনেক সাহাবী ব্যাখ্যা করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর আইনকে অস্বীকার করে, তুচ্ছ মনে করে বা এর চেয়ে উত্তম কোনো বিধান আছে বলে বিশ্বাস করে মানুষের তৈরি আইন দ্বারা শাসন করে, সে বড় কুফরিতে লিপ্ত, যা তাকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়।

তাগুতকে বিচারক হিসেবে মেনে নেওয়া

আল্লাহর বিধানের বিপরীতে যা কিছুরই আনুগত্য করা হয়, তাই ‘তাগুত’। আল্লাহ মুমিনদেরকে তাগুতকে প্রত্যাখ্যান করার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে মানুষ আল্লাহর আদালত ছেড়ে তাগুতের আদালতের দিকেই ছুটে যায়। আল্লাহ বলেন:

“আপনি কি তাদের দেখেননি যারা দাবি করে যে, আপনার প্রতি যা নাযিল হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা নাযিল হয়েছে, তার প্রতি তারা ঈমান এনেছে; অথচ তারা তাগুতকে বিচারক হিসেবে মানতে চায়, যদিও তাদের তা প্রত্যাখ্যান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর শয়তান তো তাদের ঘোর বিভ্রান্তিতে ফেলতে চায়।” — (সূরা আন-নিসা: ৬০)

এই আয়াতে স্পষ্ট, মুখে ঈমানের দাবি করার পরেও যারা বিচার-ফায়সালার জন্য আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থার দিকে যায়, তাদের ঈমানের দাবি মিথ্যা এবং এটি শয়তানের পাতা এক গভীর ফাঁদ।

মানুষের তৈরি মতবাদগুলো কীভাবে শিরক?

আসুন দেখি, প্রচলিত মতবাদগুলো কীভাবে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত হানে:

  1. গণতন্ত্র (Democracy): এর মূল ভিত্তি হলো "জনগণের সার্বভৌমত্ব" (Sovereignty of the People)। এখানে আইন রচনার চূড়ান্ত ক্ষমতা দেওয়া হয় জনগণকে বা তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের। জনগণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করতে পারে। এটি সরাসরি সূরা ইউসুফের ৪০ নং আয়াতের লঙ্ঘন, যেখানে বলা হয়েছে বিধান দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহর অধিকারকে "জনগণ" নামক এক মূর্তির হাতে তুলে দেওয়াই হলো এই ব্যবস্থার মূল শিরক।

  2. সমাজতন্ত্র/সাম্যবাদ (Socialism/Communism): এই মতবাদগুলো ধর্ম এবং ঐশী বিধানকে পুরোপুরি অস্বীকার করে। এদের মতে, আইন ও নৈতিকতার ভিত্তি হলো বস্তুবাদ এবং শ্রেণি-সংগ্রাম। এখানে আল্লাহর কোনো স্থানই নেই। এটি আল্লাহর রুবূবিয়্যাত এবং উলূহিয়্যাত উভয়কেই সরাসরি অস্বীকার করার শামিল।

  3. রাজতন্ত্র (Monarchy): যেখানে রাজা বা রানীর কথাই চূড়ান্ত আইন এবং তাদের ইচ্ছা আল্লাহর আইনের ঊর্ধ্বে স্থান পায়, সেটাও শিরক। ফেরাউন নিজেকে "সর্বোচ্চ রব" দাবি করেছিল (সূরা আন-নাযি'আত: ২৪), কারণ সে মিশরের বুকে নিজের আইন ও শাসন চালাত। আজকের রাজতন্ত্রগুলোও যদি আল্লাহর আইনকে বাদ দিয়ে নিজেদের আইন প্রতিষ্ঠা করে, তবে তা ফেরাউনি আদর্শেরই ভিন্ন রূপ।

  4. ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Secularism): এই মতবাদ বলে যে, ধর্ম থাকবে ব্যক্তিগত জীবনে (মসজিদ, গির্জা, মন্দির), আর রাষ্ট্র, সমাজ, আইন ও অর্থনীতি চলবে মানুষের তৈরি নীতিতে। এটি দ্বীনকে খণ্ডিত করার এক শয়তানি চক্রান্ত। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা, যা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশনা প্রদান করে। রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে ইসলামকে বাদ দেওয়া মানে আল্লাহর বিধানের একটি বড় অংশকে অস্বীকার করা, যা কুফরের নামান্তর।

এই সমস্ত মতবাদ একটি共同 বিশ্বাসে অটল: "আইন রচনার অধিকার মানুষের"। আর এটাই হলো তাওহীদের ভিত্তিমূলে সবচেয়ে বড় আঘাত।

আহبار ও রুহবানদের (ইহুদি ও খ্রিস্টান পণ্ডিত) ইবাদত

অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, আমরা তো এই নেতাদের সিজদা করি না, তাহলে কীভাবে এটি শিরক হলো? এর উত্তর একটি বিখ্যাত হাদিসে রয়েছে। আদী ইবনে হাতিম (রাঃ), যিনি ইসলাম গ্রহণের আগে খ্রিস্টান ছিলেন, তিনি নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে কুরআনের এই আয়াতটি শুনলেন:

“তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পণ্ডিত (আহবার) ও সংসারবিরাগী ব্যক্তিদের (রুহবান) রব হিসেবে গ্রহণ করেছে।” — (সূরা আত-তাওবাহ: ৩১)

আদী (রাঃ) বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল, আমরা তো তাদের ইবাদত করতাম না!"

নবী (ﷺ) উত্তরে বললেন: **“তারা কি এমন ছিল না যে, আল্লাহ যা হালাল করেছেন তা তারা হারাম বললে তোমরাও তা হারাম মেনে নিতে এবং আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা তারা হালাল বললে তোমরাও তা হালাল মেনে নিতে?”**

আদী (রাঃ) বললেন, "হ্যাঁ, অবশ্যই।"

নবী (ﷺ) বললেন: **“এটাই তো তাদের ইবাদত করা।”** (তিরমিযী)

এই হাদিসটি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, আল্লাহর আইনের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো মানুষ, সংসদ বা ব্যবস্থার তৈরি করা হালাল-হারামকে মেনে নেওয়াই হলো তাদের ‘রব’ হিসেবে গ্রহণ করা এবং এটাই তাদের ইবাদত। আজ যখন কোনো সংসদ আল্লাহর হারাম করা সুদকে বৈধতা দেয়, মদের লাইসেন্স দেয় বা আল্লাহর পর্দার বিধানকে বাতিল করে আইন পাশ করে, আর জনগণ তা মেনে নেয়, তখন তারা ঠিক একই শিরকে লিপ্ত হয়, যে শিরকে ইহুদি ও খ্রিস্টানরা লিপ্ত ছিল।

ইসলামে শিরক: ক্ষমার অযোগ্য পাপ এবং আপনার ঈমান রক্ষার উপায় [একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা]

উপসংহার: প্রকৃত মুক্তি এবং ঈমানের দাবি

শিরক কেবল একটি পাথরের মূর্তির সামনে মাথা নত করা নয়। শিরকের মূল হলো আল্লাহর কোনো অধিকার—তা প্রভুত্বের হোক, ইবাদতের হোক বা বিধান দেওয়ার—অন্য কাউকে দেওয়া। আজকের পৃথিবীতে মানুষ democracy, freedom, বা human rights-এর নামে বিভিন্ন মতবাদের যে আধুনিক মূর্তি তৈরি করেছে, তার সামনে আত্মসমর্পণ করা হলো সবচেয়ে خطرناک শিরক। কারণ এটি মানুষের জীবন থেকে আল্লাহকে সম্পূর্ণরূপে নির্বাসিত করে।

প্রকৃত মুক্তি মানুষের তৈরি কোনো মতবাদে নেই। প্রকৃত মুক্তি নিহিত আছে সকল প্রকার তাগুতকে অন্তর থেকে প্রত্যাখ্যান করে জীবনের সকল ক্ষেত্রে—ব্যক্তিগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক—একমাত্র আল্লাহর বিধানের সামনে পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করার মধ্যে।

আল্লাহ বলেন:

“সুতরাং তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক হিসেবে মেনে নেয়, তারপর তুমি যে ফায়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোনো দ্বিধা রাখে না এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়।” — (সূরা আন-নিসা: ৬৫)

তাই আমাদের প্রত্যেকের নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে: আমার জীবনের বিধানদাতা কে? আমি কি আমার জীবন আল্লাহর নাযিল করা কুরআনের আলোকে চালাচ্ছি, নাকি মানুষের তৈরি কোনো মতবাদের দাসত্ব করছি? এই প্রশ্নের সৎ উত্তরের উপরই নির্ভর করছে আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতের মুক্তি।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0