ঈমান ভঙ্গের কারণসমূহ | যে বিশ্বাস ও কর্মে ঈমান নষ্ট হয়

আপনার ইসলামী বিশ্বাসকে সুরক্ষিত রাখতে ঈমান ভঙ্গের মৌলিক কারণগুলো জানুন। শিরক, কুফর, বিদআত এবং এমন সব কথা ও কাজ সম্পর্কে জানুন যা অজান্তেই আপনার ঈমানকে ধ্বংস করে দিতে পারে। কুরআন ও সুন্নাহর দলিলসহ বিস্তারিত আলোচনা।

Oct 9, 2025 - 10:54
Oct 9, 2025 - 11:01
 0
ঈমান ভঙ্গের কারণসমূহ | যে বিশ্বাস ও কর্মে ঈমান নষ্ট হয়
Ai Generated Image

ঈমানের সুরক্ষা: একটি সতর্কবার্তা

যেসব বিশ্বাস, কথা ও কর্মে ঈমান ভঙ্গ হয়

একজন মুসলিমের জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার ঈমান। দুনিয়ার সকল ধন-সম্পদ, মণি-মুক্তার চেয়েও এর মূল্য অনেক বেশি। আমরা আমাদের পার্থিব সম্পদ রক্ষায় যতটা সচেতন, ঈমানের সুরক্ষায় কি ততটা সচেষ্ট? অথচ ঈমান এমন এক ভিত্তি, যার ওপর আমাদের পরকালের মুক্তি নির্ভরশীল। অজু করলে যেমন কিছু নির্দিষ্ট কারণে তা ভেঙে যায়, তেমনি ঈমান আনার পরেও এমন কিছু কথা, বিশ্বাস ও কাজ রয়েছে যা আমাদের ঈমানকে ধ্বংস করে দেয়। এ বিষয়ে অজ্ঞতা আমাদের জন্য চিরস্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারে।

এই আর্টিকেলে আমরা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ঈমান ভঙ্গের এমন ১৫টি মৌলিক কারণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যা প্রত্যেক মুসলিমের জানা অপরিহার্য।

  1. ১. আল্লাহর সাথে শিরক করা

    এই শিরক কোনো মূর্তির সামনে সিজদা করা নয়, বরং এটি হলো মানুষের তৈরি জীবন ব্যবস্থার সামনে আত্মসমর্পণ করা। এটি হলো আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করে মানুষের সার্বভৌমত্বকে মেনে নেওয়া। এটি হলো আল্লাহর নাযিল করা জীবনবিধান, পবিত্র কুরআনকে বাদ দিয়ে মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত মতবাদ—যেমন গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে জীবন পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা। এটিই হলো আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিরক—শিরক ফিল হুকুম (শাসনে অংশীদারিত্ব) বা তাওহীদুল হাকিমিয়্যার (আল্লাহর সার্বভৌমত্বের একত্ববাদ) লঙ্ঘন।

    দলিল: সূরা নিসা ৪:৪৮, ১১৬; সূরা মায়িদাহ ৫:৭২; সূরা আন‘আম ৬:৮৮; সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:২২, ৩৯; সূরা মু'মিনূন ২৩:১১৭; সূরা যুমার ৩৯:৬৫
  2. ২. ঈমান ও ইসলামের মৌলিক বিষয়ে অবিশ্বাস

    ইসলামের কিছু মৌলিক ভিত্তি রয়েছে, যেমন—আল্লাহর অস্তিত্ব, ফেরেশতা, আসমানি কিতাব, নবী-রাসূল, আখিরাত এবং তাকদীরের উপর বিশ্বাস। এগুলোর কোনো একটিকে অস্বীকার করা, সন্দেহ করা বা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানানো ঈমান ভঙ্গের কারণ। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি বলে "আমি কুরআনকে আল্লাহর বাণী বলে মানি না" অথবা "পরকাল বলতে কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না", তবে তার ঈমান থাকবে না।

    দলিল: সূরা মায়িদাহ ৫:৫
  3. ৩. কাফির-মুশরিকদের কাফির মনে না করা

    যে ব্যক্তি সুস্পষ্টভাবে ইসলামকে অস্বীকার করে, শিরক বা কুফরে লিপ্ত হয়, কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী সে কাফির। এমন ব্যক্তিকে যদি কেউ কাফির মনে না করে, অথবা তার কুফরি কাজের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করে, কিংবা তার ভ্রান্ত পথকে সঠিক বলে মনে করে, তবে তার নিজের ঈমানও ভঙ্গ হয়ে যাবে। কারণ, এটা প্রকারান্তরে আল্লাহর বিধানকেই অস্বীকার করার শামিল।

    দলিল: সূরা নিসা ৪:১৪৪; সূরা তাওবাহ ৯:২৩; সূরা বাইয়্যিনাহ ৯৮:৬; সূরা বাকারাহ ২:২২১
  4. ৪. হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল মনে করা

    ইসলামে কোনো কিছু হালাল বা হারাম করার একমাত্র অধিকার আল্লাহ তা'আলার। যেসকল বিষয়কে (যেমন: মদ, শূকরের মাংস, সুদ, ব্যভিচার) কুরআন ও সুন্নাহতে সুস্পষ্টভাবে হারাম করা হয়েছে, সেগুলোকে যদি কেউ হালাল মনে করে, তবে সে আল্লাহর আইনকে অস্বীকার করলো। একইভাবে, আল্লাহ যা হালাল করেছেন (যেমন: হালাল ব্যবসা, একাধিক বিবাহ) তা হারাম মনে করাও ঈমান ভঙ্গের কারণ।

    দলিল: সূরা আত-তাওবাহ ৯:২৯; সূরা ইউনুস ১০:৫৯; সূরা আন নাহল ১৬:১১৬
  5. ৫. রাসূল (ﷺ)-এর আদর্শের চেয়ে অন্য মতবাদকে উত্তম মনে করা

    ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। যদি কেউ মনে করে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দেখানো পথের চেয়ে মানুষের তৈরি কোনো মতবাদ—যেমন গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, কমিউনিজম, সেক্যুলারিজম বা জাতীয়তাবাদ—মানবজাতির জন্য বেশি কল্যাণকর বা যুগোপযোগী, তবে সে ইসলামকে অসম্পূর্ণ মনে করলো। এই বিশ্বাস ঈমানকে ধ্বংস করে দেয়।

    দলিল: সূরা নিসা ৪:১১৫, সূরা আহযাব ৩৩:৩৬
  6. ৬. রাসূল (ﷺ) ছাড়া অন্য কাউকে উত্তম আদর্শ ভাবা

    মুসলিমদের জন্য একমাত্র এবং সর্বোত্তম আদর্শ হলেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)। তাঁর আদর্শকে বাদ দিয়ে যদি কেউ কোনো রাজনৈতিক নেতা, দার্শনিক বা তথাকথিত মহাপুরুষকে (যেমন: আব্রাহাম লিংকন, স্ট্যালিন, লেলিন, কামাল পাশা) নিজের জীবনের জন্য উত্তম আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে, তবে সে রাসূলের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করলো, যা ঈমান পরিপন্থী।

    দলিল: সূরা আহযাব ৩৩:২১
  7. ৭. ইসলাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া

    আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দ্বীন হলো ইসলাম। এই দ্বীনকে গ্রহণ করার পর তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, এর বিধি-বিধানকে অস্বীকার করা বা পালন করতে অনীহা প্রকাশ করা হলো ارتداد (ইরতিদাদ) বা ধর্মত্যাগ, যা সরাসরি কুফর। যেমন—নামাজ, রোজা, যাকাত ইত্যাদি ইসলামের মৌলিক বিধানকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে তা ত্যাগ করা।

    দলিল: সূরা মায়িদাহ ৫:৫৪; সূরা আল-বাকারাহ ২:২১৭; সূরা সাজদাহ ৩২:২২; সূরা মু'মিনূন ২৩:৭২; সূরা কাহফ ১৮:৫৭; ত্ব-হা ২০:১২৪-১২৬; সূরা যুমার ৩৯:৫৩
  8. ৮. ইসলামকে অসম্পূর্ণ মনে করা

    আল্লাহ তা'আলা ইসলামকে পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। যদি কেউ মনে করে যে, ইসলামে নতুন কিছু যোগ করা বা পুরাতন কিছু বাদ দেওয়া প্রয়োজন (বিদ'আত), অথবা একে আধুনিক যুগের সাথে তাল মেলাতে "আপডেট" করতে হবে, তবে সে আল্লাহর ঘোষণাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো। এই বিশ্বাস ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক।

    দলিল: সূরা মায়িদাহ ৫:৩
  9. ৯. আল্লাহর আইন ছাড়া অন্য আইনে বিচার করা

    বিচার ও শাসনের সর্বোচ্চ ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। যদি কেউ আল্লাহর আইনকে বাদ দিয়ে মানব রচিত আইন দ্বারা বিচার-ফয়সালা করে এবং এই কাজকে জায়েয বা আল্লাহর আইনের চেয়ে উত্তম মনে করে, তবে সে কুফরি করলো। আল্লাহর আইনকে পুরাতন বা বর্তমান যুগের জন্য অচল মনে করাও ঈমান ভঙ্গের কারণ।

    দলিল: সূরা মায়িদাহ ৫:৪৪
  10. ১০. ইসলামী শরীয়াতের প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়া

    একজন মু'মিনের অন্তর আল্লাহর সকল বিধানে সন্তুষ্ট থাকবে। যদি ইসলামী শরীয়াতের কোনো বিধান অনুযায়ী বিচার করা হলে কারো অন্তরে সংকোচ বা কষ্ট অনুভূত হয় এবং সে মানব রচিত আইনের কাছে বিচার চাইতে স্বস্তি বোধ করে, তবে তা ঈমানের দুর্বলতা নয়, বরং ঈমানহীনতার লক্ষণ।

    দলিল: সূরা নিসা ৪:৬০, ৬৫
  11. ১১. দ্বীনের কোনো বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা

    আল্লাহ, তাঁর রাসূল (ﷺ), কুরআন, নামাজ, পর্দা, দাড়ি বা ইসলামের যেকোনো নিদর্শন বা বিধান নিয়ে উপহাস, ব্যঙ্গ বা ঠাট্টা করা সুস্পষ্ট কুফরি। হাসি-তামাশার ছলেও এ ধরনের কাজ ঈমানকে ধ্বংস করে দেয়। কারণ, যাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা হয়, তাঁকে বা তাঁর বিধানকে নিয়ে বিদ্রূপ করা যায় না।

    দলিল: সূরা মায়িদাহ ৫:৫৭-৫৮; সূরা নিসা ৪:১৪০, সূরা তাওবাহ ৯:৬৫-৬৬; সূরা জাসিয়া ৪৫:৯-১০, ৩৪-৩৫, সূরা আম্বিয়া ২১:২
  12. ১২. জাদু, টোনা বা ভাগ্য গণনার আশ্রয় নেওয়া

    জাদু বা ব্ল্যাক ম্যাজিক কুফরের অন্তর্ভুক্ত। এর মাধ্যমে শয়তানের সাহায্য নিয়ে মানুষের ক্ষতি করার চেষ্টা করা হয়। একইভাবে, গণকের কাছে গিয়ে ভাগ্য সম্পর্কে জানতে চাওয়া, রাশিচক্রে বিশ্বাস করা বা কোনো মন্ত্র-তন্ত্রের মাধ্যমে ভালো-মন্দ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা শিরক এবং ঈমান বিধ্বংসী কাজ। কারণ এতে আল্লাহর ক্ষমতার উপর অবিশ্বাস করা হয়।

    দলিল: সূরা বাকারাহ ২:১০২, ১০৭; সহীহ মুসলিম: ১৬৩; সহীহ বুখারী: ৫৭৬৪; সুনান নাসাঈ: ৪০৭৯
  13. ১৩. মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফিরদের সাহায্য করা

    ঈমানের অন্যতম দাবি হলো মুসলিমদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতা বজায় রাখা। এর বিপরীতে, যদি কোনো মুসলিম অন্য মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফির বা মুশরিকদের অর্থ, অস্ত্র, তথ্য বা যেকোনো উপায়ে সাহায্য-সহযোগিতা করে, তবে এটি ঈমান ভঙ্গের কারণ হিসেবে গণ্য হবে।

    দলিল: সূরা তাওবাহ ৯:২৩; সূরা মায়িদাহ ৫:৫১; সূরা মুমতাহিনা ৬০:১-২
  14. ১৪. নিজেকে নবী দাবি করা

    ইসলামের অকাট্য বিশ্বাস হলো, হযরত মুহাম্মদ (ﷺ) আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল। তাঁর পরে আর কোনো নতুন নবী আসবেন না। যে ব্যক্তি নিজেকে নবী হিসেবে দাবি করবে, সে দাজ্জাল ও কাফির। একইভাবে, যে তাকে নবী হিসেবে বিশ্বাস করবে, সেও কাফির হয়ে যাবে।

    দলিল: সূরা আহযাব ৩৩:৪০, মিশকাতুল মাসাবীহ: ৫৪০৬
  15. ১৫. মুনাফিকি করা

    মুনাফিকি হলো মুখে ঈমানের দাবি করা কিন্তু অন্তরে ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ ও অবিশ্বাস গোপন রাখা। মুনাফিকরা গিরগিটির মতো রং বদলায়, মুসলিমদের ক্ষতি করার জন্য গোপনে ষড়যন্ত্র করে এবং কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব রাখে। এই ধরনের বড় মুনাফিকি (النفاق الاعتقادي) সুস্পষ্ট কুফর এবং এর শাস্তি জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তর।

    দলিল: সূরা তাওবাহ ৯:৬৭, ৬৮; সূরা আল আহযাব ৩৩:৭৩; সূরা ফাতহ ৪৮:৬; সূরা নিসা ৪:১৪২, ১৪৫; সূরা মায়িদাহ ৫:৬১, সূরা মুনাফিকুন ৬৩:১, সূরা বাকারাহ ২:৮-১০

উপসংহার

উপরোক্ত কারণগুলো জানার পর আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজের ঈমানকে প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করা। শয়তান এবং প্রবৃত্তির ধোঁকায় পড়ে আমরা যেন ঈমানহারা না হয়ে যাই, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। যদি অজ্ঞতাবশত বা ভুলক্রমে এগুলোর কোনো একটিতে লিপ্ত হয়ে পড়েন, তবে অবিলম্বে আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে তওবা করে সঠিক পথে ফিরে আসুন। আল্লাহ তা'আলা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0